পার্থেনিয়াম উদ্ভিদ আমাদের মৃত্যুদূত | ePakhi

298
parthenium-plant2
পার্থেনিয়াম | ছবিঃ ইন্টারনেট

পার্থেনিয়াম একটি উদ্ভিদ; একটি আগাছার নাম। যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশে বাঁচতে সক্ষম এ আগাছা। বিশেষ করে ফসলের খেত কিংবা রাস্তার দুধারে এ আগাছাটি বেশি জন্মে। আগাছাটির বেঁচে থাকতে কোনো ধরনের যত্ন-আত্তির প্রয়োজন পড়ে না। খুব সহজেই প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এটি উপমহাদেশীয় অঞ্চলের নিজস্ব উদ্ভিদ নয়, আনা হয়েছে মেক্সিকো থেকে। ছড়িয়ে পড়েছে গোটা উপমহাদেশে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, চীন, পাকিস্তান, নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এটি বেশি নজরে পড়ে সীমান্তবর্তী জেলার রাস্তার দুধারে। এ ছাড়াও দেশের অন্যান্য জেলায় কমবেশি দেখা যায়। তবে বাংলাদেশে এখনো ফসলের খেতে দেখা যায়নি।

এটি ছড়িয়েছে কয়েকভাবে। গরুর গোবর, গাড়ির চাকার সঙ্গে লেপটে, সেচের মাধ্যমে এবং জুতার তলার কাদার সঙ্গে লেপটে। ছড়িয়েছে বাতাসের মাধ্যমেও। অনেকের ধারণা এর বীজ গমের মাধ্যমে আমাদের দেশে এসেছে।

এ গাছ সাধারণত এক থেকে দেড় মিটার উচ্চতার হয়। অসংখ্য শাখা ত্রিভুজের মতো ছড়িয়ে থাকে। ছোট ছোট সাদা ফুল হয়। ঠিক যেন ধনিয়াগাছের ফুল। হঠাৎ করে দেখলে যে কেউ ভুল করবেন ধনিয়াগাছ ভেবে। গাছটির আয়ুষ্কাল মাত্র তিন-চার মাস। এ আয়ুষ্কালের মধ্যে তিনবার ফুল ও বীজ দেয় গাছটি। ফুল সাধারণত গোলাকার, সাদা, পিচ্ছিল হয়। এ গাছ তিন-চার মাসের মধ্যে ৪ থেকে ২৫ হাজার বীজ জন্ম দিতে সক্ষম।

আগাছাটি অত্যন্ত ভয়ংকর। গবাদিপশু চরানোর সময় গায়ে লাগলে পশুর শরীর ফুলে যায়। এছাড়াও তীব্র জ্বর, বদহজমসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়। আর পশুর পেটে গেলে কেমন বিষক্রিয়া হতে পারে তা অনুমেয়। বিশেষ করে গাভী পার্থেনিয়াম খেলে দুধ তিতা হয়। ওই দুধ অনবরত কেউ খেলে সেই মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

শুধু পশুই নয়, আগাছাটি মানুষের হাতে-পায়ে লাগলে চুলকে লাল হয়ে ফুলে যায়। আক্রান্ত মানুষটি ঘনঘন জ্বর, অসহ্য মাথাব্যথা ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগতে থাকে। এমনকি মারাও যেতে পারেন মানুষটি। গণমাধ্যম মারফত জানা যায়, ভারতের পুনেতে পার্থেনিয়ামজনিত বিষক্রিয়ায় ১২ জন মানুষ মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। এতসব ভয়ংকর বিষয় জানতে পেরে পরিবেশবিদরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তাই এ উদ্ভিদের বিষয়ে। আতঙ্কিত হয়েছেন উপমহাদেশের কৃষিবিদরাও। তারা এটিকে বিষাক্ত আগাছা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এটি শুধু বিষাক্তই নয়, যেকোনো ধরনের ফসলের ব্যাপক ক্ষতিও করে। প্রায় ৪০ শতাংশ ফসল কম ফলে, যদি কোনো খেতে পার্থেনিয়ামের বিস্তার ঘটে।

এসব ক্ষতিকর দিক পর্যালোচনা করে কৃষিবিদরা গাছটিকে পুড়িয়ে ফেলতে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সতর্ক না হলে যেকোনো ব্যক্তি বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন। যেমন-এটি কেউ কাটতে গেলে ওই ব্যক্তির হাতে-পায়ে লাগতে পারে। পোড়াতে গেলে ফুলের রেণু দূরে উড়ে বংশবিস্তার করতে পারে। আবার ব্যক্তির নাকে-মুখেও লাগতে পারে। তাতে তিনি মারাত্মক বিষক্রিয়ায় পড়তে পারেন। এ ক্ষেত্রে খুব সতর্কতার সঙ্গে প্রথমে গাছটিকে কাটতে হবে। হাতে গ্লাভস, চোখে চশমা থাকলে ভালো হয়। অবশ্যই পা ভালোমতো ঢেকে রাখতে হবে। মোটা কাপড়ের প্যান্টের সঙ্গে বুটজুতা পরা যেতে পারে, সঙ্গে মোটা কাপড়ের জামাও পরতে হবে।

গাছকাটা হলে গভীর গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে। এ ছাড়াও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আগাছানাশক ব্যবহার করে এ গাছ দমন করা যায়। সে ক্ষেত্রে ডায়ইউরোন, টারবাসিল, ব্রোমাসিল আধা কেজি ৫০০ লিটার জলে মিশিয়ে হেক্টর প্রতি প্রয়োগ করতে হবে। আবার প্রতি হেক্টরে দুই কেজি ২.৪ সোডিয়াম লবণ অথবা এমসিপি ৪০০ লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করেও এ আগাছা দমন করা যেতে পারে। যেমনটি নিধন করছেন পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার তরুণরা।

parthenium-plant
পার্থেনিয়াম | ছবিঃ ইন্টারনেট

কৃষিবিদদের অভিমত, পার্থেনিয়াম নিধনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে জৈবিক প্রক্রিয়ায় দমন করা। তাতে ক্ষতির আশঙ্কা নেই বললেই চলে। এ পদ্ধতিতে নানা ধরনের পাতাখেকো অথবা ঘাসখেকো পোকার মাধ্যমে পার্থেনিয়াম দমন করা সম্ভব। কিন্তু সে ক্ষেত্রে কিছু বিপত্তি আমরা লক্ষ করেছি। যেমন, পাতাখেকো পোকার বিস্তার ঘটানো যখন-তখন সম্ভব হয় না। বিশেষ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে উদ্ভিদটি বিনাশ করতে না পারলে সমস্যাটা থেকেই যায়। কারণ এ উদ্ভিদের ফুল ও বীজ অল্প সময়ের মধ্যেই পরিপক্ব হয়। পাতাখেকো পোকা অল্প সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে সাবাড় করতে না পারলে বীজ হাওয়ায় উড়ে অনেক দূর চলে যাবে। সুতরাং এ দূরদর্শী বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে আমাদের।

আরো পড়ুন…
•পরিযায়ী পাখিদের কথা
•বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথে যেসব বন্যপ্রাণী

পার্থেনিয়াম নিয়ে বাংলাদেশের জন্য সামান্য সুখবর আছে। সুখবরটি হচ্ছে, বাংলাদেশে এখনো পার্থেনিয়ামের বিষক্রিয়ায় কেউ আক্রান্ত হননি। আবার গবাদি পশুর ব্যাপারেও এ ধরনের উদ্বেগজনক খবর আমাদের কানে এসে পৌঁছায়নি। কাজেই আমাদের উচিত এখনই সতর্ক হওয়া-যেসব স্থানে অথবা জেলায় পার্থেনিয়ামের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেখানে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে কৃষকদের অবহিত করা এবং আগাছাটি নিধনের পরামর্শ দেওয়া।

পার্থেনিয়াম সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য রয়েছে, যা না জানালেই নয়। আগাছাটি মানুষ ও গবাদি পশুর যেমন ক্ষতি করে, তেমনি আবার উপকারও করে। এর রয়েছে কিছু ঔষধি গুণ। এই আগাছা থেকে মানুষের জ্বর, বদহজম, টিউমার, আমাশয়সহ নানা ধরনের জটিল রোগের প্রতিষেধক তৈরি হচ্ছে। এমনকি গবেষকরা মরণব্যাধি ক্যানসারেরও প্রতিষেধক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে আমরা ধরে নিতে পারি, উপকার বা অপকার দুটিতেই সক্ষম পার্থেনিয়াম। তাই বলে যত্রতত্র এ আগাছার বংশবিস্তার কারও কাম্য নয়। ওষুধের প্রয়োজনে সংরক্ষিত এলাকায় এটি চাষাবাদ হতে পারে; কিন্তু সেটি এতদাঞ্চলের জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। সুতরাং সাধারণভাবে আমরা এটিকে নিধন করাই শ্রেয় মনে করি। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে কাউন্সেলিং করতে হবে ব্যাপকভাবে। তবেই পার্থেনিয়াম থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। অন্যথায় এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে উপমহাদেশীয় অঞ্চলে। যেমনি ছড়িয়েছে ব্রাজিল থেকে আসা কচুরিপানা। এটি এখন উপমহাদেশের অধিকাংশ জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং আমাদের পার্থেনিয়াম নিয়ে এখনই ভাবতে হবে, তা না হলে এর ক্ষতিকর প্রভাব সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, পার্থেনিয়াম উদ্ভিদ অনেকেই চেনেন না, ফলে আগাছাটি সম্পর্কে কৃষিবিদদের কড়াকড়ি বা সতর্কতা জারি করা সত্ত্বেও এই উদ্ভিদের ফুল দেশের বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হচ্ছে। এ খবরও আমরা গণমাধ্যম মারফত জানতে পেরেছি। মূলত মারাত্মক এ ফুলগুলো সম্পর্কে দোকানিরা না জেনেই বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখছেন। আর ক্রেতারাও না জেনে সেই ফুল কিনছেন। তাই এখনই সতর্ক হতে হবে আমাদের। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে পার্থেনিয়াম চেনাতে হবে আমজনতাকে। নয়তো একসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা মহামারির দিকে মোড় নিতে পারে। কাজেই আসুন, সময় থাকতেই আমরা সাবধান হই!