জাতীয় ফুল শাপলা খেতে হবে কেন?

853
জাতীয় ফুল শাপলা
শাপলা জাতীয় ফুল শাপলাফুল | ছবিঃ ইন্টারনেট

জাতীয় ফুল শাপলা যে কোনো জাতির পরিচিতি লাভের জন্য জাতীয় প্রতীক নির্বাচন করা হয়। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে জাতীয় প্রতীকগুলো। সে মতে আমাদেরও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের জাতীয় প্রতীক। প্রতীকগুলোকে জাতীয় বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তেমনি ফুলের ক্ষেত্রে শাপলা আমাদের জাতীয় ফুলের মর্যাদা লাভ করেছে।

আমরা জানি, বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমি নিম্নাঞ্চল। এখানে অসংখ্য খালবিল, হাওর-বাঁওড়, নদীনালার অবস্থান। এ স্থানের জলজ পরিবেশে যেসব ফুল গাছ বা জলজ উদ্ভিদ জন্মায় তা বাংলাদেশ-ভারতের নিজস্ব উদ্ভিদ। তেমনি শাপলাও ভারত-বাংলাদেশের নিজস্ব ফুল। ফুলটি বছরের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া দেখা যায় না। শুধু বর্ষা  মৌসুমে খালবিল, নদীনালা, হাওর-বাঁওড়, পুকুর কিংবা নিচু জলাভূমিতে শাপলা জন্মে। প্রায় অযত্ন-অবহেলায় এটি বেড়ে ওঠে। কোনো প্রকার চাষাবাদেরও প্রয়োজন পড়ে না। স্রোতবিহীন জলাশয়ের কাদামাটিতে সুপ্ত থাকা শালুক থেকে শাপলা গাছের জন্ম হয়। বর্ষার জল বাড়লেই শালুক থেকে গুল্মজাতীয় সরু নল বেরিয়ে থালাকৃতির পাতাসমেত জলের ওপর ভেসে থাকে গাছটি। ঠিক ওটার নিচ দিয়ে গজিয়ে ওঠে কিছু মোটাসোটা গোলাকৃতির ফাঁপা ডাঁটা, যার মাথায় থাকে ডিম্বাকৃতির বা কলার মোচার মতো কুঁড়ি। সেই কুঁড়িটি ফুটলেই নাম ধারণ করে ‘শাপলা’। সাধারণত তিন প্রকারের শাপলা জন্মে আমাদের দেশে। লাল, সাদা ও নীল। লাল শাপলা ‘রক্তকমল’ ও নীল শাপলা ‘নীলকমল’ নামে পরিচিত। এর মধ্যে মনোহরণকারী ধবধবে সাদা শাপলাটিই আমাদের জাতীয় ফুল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শাপলা ফুলের আয়ুষ্কাল এক সপ্তাহের কিছু বেশি। অন্যসব ফুলের মতো শাপলা সব সময় প্রস্ফুটিত থাকে না; রাতে ফোটে। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে পাপড়িগুলো সংকোচিত হয়। সংকোচিত এবং প্রস্ফুটিত হওয়ার মধ্যে দারুণ এক মজার বিষয় লক্ষ করা যায় তখন। আর সেটি হচ্ছে, যে ফুলের পাপড়ি যে সময়ে প্রস্ফুটিত হয়, পরের দিন সেই ফুলের পাপড়ি ঠিক এক ঘণ্টা পর প্রস্ফুটিত হবে। আবার সেটি সংকুচিতও হবে ঠিক এক ঘণ্টা পরে।

দুই বাংলা ছাড়া সাদা শাপলা বিশ্বের আর কোথাও ব্যাপক হারে দেখা যায় না। তবে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, তাইওয়ান, ইয়েমেন, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার জলাশয়ে যত্সামান্য দেখা যায়।

আরো পড়ুন…
•বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথে যেসব বন্যপ্রাণী
•পার্থেনিয়াম উদ্ভিদ আমাদের মৃত্যুদূত
•পরিযায়ী পাখিদের কথা

গুল্মজাতীয়ঃ এ গাছটি বাংলার আনাচকানাচে পুকুর-ডোবায় বেশ সহজেই জন্মে, যা অন্যসব দেশে দুর্লভই বটে। সহজলভ্য ফুলগুলোকে আমরা সঠিক মূল্যায়ন করতে পারিনি কখনো। উলটো হাতের নাগালে পেয়ে নির্বিচারে নিধন করে যাচ্ছি আমরা শাপলাগাছকে। আর সুস্বাদু তরকারি হিসেবে খাদ্য তালিকায় স্থান দিয়ে রেখেছি আমরা বহু যুগ আগে থেকেই। জাতীয় মাছের সঙ্গে জাতীয় ফুলের তরকারি না হলে যেন জমেই না আমাদের। প্রশ্নবিদ্ধ হতেই পারে জাতীয় ফল এবং জাতীয় মাছ খেতে দোষ নেই, ফুলের বেলায় ন্যকামোটা কেন? জাতীয় ফল ও জাতীয় মাছ বংশ বিস্তারের ক্ষেত্রে যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে ধরনের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি শাপলার বংশ বিস্তারের জন্য। ঘটেছে বরং উলটোটা; আমরা শাপলা, শালুক, ডাঁটা, ভেট (ফলসুদ্ধ) খাচ্ছি। সোজা কথা এ ফুলগাছটির একেবারে গোড়া থেকে আগা অবধি খাচ্ছি আমরা। অথচ আমাদের দেশে সবজির আকাল যাচ্ছে না মোটেও। যত্রতত্র সবজি ফলছে যেমনি, তেমনি দেশের চাহিদার জোগান দিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সবজির সংকটে শাপলা খাচ্ছি না; খাচ্ছি রসনাবিলাসের জন্য। অথবা সবাই খাচ্ছে আমিও খেয়ে দেখি, এ ধরনের মানসিকতার জন্য আমরা শাপলা খাচ্ছি। আমরা শাপলাকে টাকা, পোস্টকার্ড কিংবা ইনভেলাপে স্থান দিয়েছি সত্যি, কিন্তু অন্তরে স্থান দিতে পারিনি বোধকরি এখনো। ন্যূনতম মমতা থাকলেও অমন নির্দয়ভাবে শাপলা নিধন করতে পারতাম না। যে হারে শাপলা সাবাড় করছি আমরা তাতে করে অচিরেই ফুলটি দেশ থেকে হারিয়ে গেলে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই থাকবে না। সে বোধ থেকেই হয়তো আমাদের দেশের জাতীয় পত্রিকাগুলো বারবার শাপলা বিনষ্টের অশনিসংকেত জানিয়ে সংবাদ পরিবেশন করছে। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হচ্ছে যে, বিশ্বের আর কোনো দেশের মানুষই জাতীয় ফুল খাচ্ছে না, যা খাচ্ছি আমরা। শ্রীলঙ্কার জাতীয় ফুল নীল শাপলা হলেও তারা সে ফুল খাচ্ছে না। কাজেই সাবধান হতে হবে আমাদেরকেও। না হলে একদিন শাপলা ফুলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। আগামী প্রজন্মকে শাপলা ফুল চিনাতে ব্যাপক পুস্তকাদি ঘাটতে হবে অথবা ইন্টারনেটের শরণাপন্ন হতে হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় জোগ হচ্ছে। শুধু যে, শাপলার সবজি খেয়ে অস্তিত্ব সংকটে ফেলছি আমরা তা কিন্তু নয়, আয়ুর্বেদিক ওষুধ বানাতেও শাপলার প্রয়োজন পড়ছে, সে কারণেও শাপলা নিধন হচ্ছে ব্যাপক। অন্যদিকে আমাদের কৃষিজমিতে অধিক মাত্রায় কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলেও শাপলার বীজ অর্থাত্ শালুক ধ্বংসের সম্মুখীন হচ্ছে। আবার লাঙলের ফলা অথবা ট্রাক্টরের ফলার আঁচড়েও শালুক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা জলাশয় ভরাটের কারণেও শাপলার অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে।

আমরা একটু সচেতন হলেই বোধকরি শাপলার অস্তিত্ব সংকট রোধ করতে পারি। জানি, শাপলা ফুল চাষাবাদ করে টিকিয়ে রাখার মতো নয়। তাই এক্ষেত্রে দরকার একটু জনসচেতনা। সে প্রচেষ্টা সরকারি-বেসরকারি কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করা যেতে পারে। তাহলে হয়তো আমাদের জাতীয় ফুলের সুরক্ষা সম্ভব হতে পারে।

লেখকঃ আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।